যে কারণে হানাফিই রয়ে গেলাম ! জাগ্রত কবি মুহিব খান

ছোট বেলা থেকে না জেনেই হানাফী মাজহাব পালন করে বড় হয়েছি। নামাজ শিক্ষার যে বই গুলি বাসায় ছিল – সব ছিল নিউজপ্রিন্টের। ভিতরে খালি মাসআলা ছিল। কুরআন হাদিসের কোন রেফারেন্স ছিলোনা। ছিল ব্র্যাকেটে ফতোয়ায়ে আলমগিরির রেফারেন্স। যা কি জিনিস জানতাম না।

বড় হলে আহলে হাদীস ও সালাফিদের বই পড়লাম। কুরআন ও হাদিসের প্রচুর রেফারেন্স দেয়াতে খুব ভালো লাগলো। তারা বললো: তুমি এসব মাজহাব ছাড়। সহীহ হাদিস মেনে ইবাদত করো। অন্ধ তাকলীদ করো না।

হানাফীরা ইমাম আবু হানিফা ও অন্যন্য মুকাল্লিদরা অন্যন্য ইমামদের ফিকহ মানে, এর চেয়ে সহীহ হাদিস মানো । একটু এক্সট্রিম কেউ কেউ তাকলীদকে শিরক বললো, বললো বুদ্ধি থাকলে তাকলীদ করতে হবে কেনো। এরকমই আরো কিছু কথা সুন্দর সুন্দর কথা ।

আমার কথা গুলো বেশ মনে ধরলো। হানাফী থেকে আহলে হাদীস ইচ্ছা জাগলো । মাজহাবের তাকলীদ বাদ দিয়ে সহীহ হাদিসের উপর আমল করার ইচ্ছা জাগলো। হাতে টাকা ছিল – জোগাড় করলাম সিহাহ সিত্তাহ, বাংলা-আরবী। আরবী স্কিপ করে বাংলায় সহীহ হাদিস পড়া শুরু করলাম।

কিন্তু ওযু ও গোসল অধ্যায়ই শেষ করতে পারলাম না। নামাজ তো আরো পরে।
রাসূলুল্লাহ (দঃ) এর ওযুর বিভিন্ন ধরণের বর্ণনা আছে। কোনটা মেনে ওযু করবো ? ছোট একটা জিনিসই ধরি। কিছু জায়গায় অঙ্গ দুবার করে ধোয়ার কথা বলা আছে , কিছু জায়গায় তিনবার, কিছু জায়গায় একবার। আমি যদি দুবার করে ধৌত করি তাহলে একটা সহীহ হাদিস আমি মান্য করছিনা, তিন বার ধুলে অন্য আরেকটি সহীহ হাদিস মান্য করছিনা ।

প্রশ্ন ১: আমি এই যে কিছু সহীহ হাদিস মানতে যেয়ে অন্য সহীহ হাদিস মান্য করছিনা, সেগুলো খুঁজে খুঁজে বের করে রেফারেন্স দিয়ে কেউ যদি বলে আমি সহীহ হাদিস মানিনা সেটা কি ঠিক হবে ? এর মানে কি আমি সহীহ হাদিস অমান্যকারী ?

এখন আমার কথা না হয় বাদই দিলাম। আমি পড়ালেখা করেছি, বই পড়ার উৎসাহ আছে, ইসলামের প্রতি ঝোক আছে। এদের কথা ধরেন : আমাদের বাসার বুয়া বা বিল্ডিং এর কেয়ারটেকার পড়াশোনা করতে পারেনা। আমার বন্ধু কয়েকজন যারা পড়ালেখা জানলেও ইসলামী বই অধ্যায়ন করেনা কারণ ইসলামের প্রতি আগ্রহ নেই । আমার ছেলে যার বয়স যখন ৭ হয়েছে। এদের কেউ ওযু পারেনা।

প্রশ্ন ২: তাদের কে শিখানোর জন্য যদি আমি যদি বুখারীর ও অন্যন্য হাদিস গ্রন্হের ওযু অধ্যায়ের সহীহ হাদিস গুলি সিরিয়ালি তাদের কাছে শুধু বাংলায় রিডিং পড়া শুরু করি, তারা কি সেগুলি বুঝে ঠিক মতো আমল করতে পারবে ?

প্রশ্ন ৩: যদি তারা না বুঝে তাহলে তো আমাকে তাদের দেখিয়ে দিতে হবে কিভাবে ওযু করতে হয় । তখন আমি বুখারীর ও অন্যন্য হাদিস গ্রন্হের ওযু অধ্যায়ে উল্লেখিত বাংলা সহীহ হাদিস গুলি সমন্বয় করে বা সেখান থেকে বেছে নিয়ে আমার বুঝ অনুযায়ী তাদের শিখাবো। এতে কি তারা সহীহ হাদিস মানলো নাকি আমার বুঝ ও ব্যাখ্যা মানলো ? এই ব্যাখ্যাই কি ফিকহ না ?

প্রশ্ন ৪: যখন আমি বুঝিয়ে দিচ্ছি, তখন আমার হাদিসের টেক্সট ও রেফারেন্স দেয়া কি আমার জন্য জরুরি হবে ? বাস্তবেই কি তারা প্রত্যেকটির শিক্ষার পিছনের হাদিসের রেফারেন্স চাবে ? নাকি বলবে শুধু ওযু শিখিয়ে দাও ? এটি কি আমার উপর বিশ্বাস করে অন্ধ তাকলীদ করা নয় কি ? যদি রেফারেন্স দিয়েও দি তাও কি তারা সহীহ থেকে জাল হাদিস পার্থক্য করতে পারবে ?

প্রশ্ন ৫:একটি হাদিস যে আমি সহীহ হাদিস কিভাবে বুঝছি ? ব্র্যাকেটে লেখা আছে বলে। আমার সামর্থ্য নাই হাদিস শাস্ত্র অধ্যয়ন করে সহীহ যঈফ আলাদা করার। কেউ তাহকীক করে লিখে দিয়েছে। সেটাই চোখ বন্ধ করে মেনে নিচ্ছি। কেউ বুখারী অনুবাদ করে দিয়েছে, আমিও মেনে নিচ্ছি সেটা সঠিক অনুবাদ, কারণ আমার পক্ষে আরবি বুঝে অনুবাদের ত্রুটি ধরা সম্ভব না । এই তাহকীক ও অনুবাদ যে সঠিক মেনে নেয়া হচ্ছে সেটা কি অন্ধ তাকলীদ নয় ?

প্রশ্ন ৬: ওযুর মতো অতি সহজ ব্যাপারে আমার যদি এই অবস্থা হয়, নামাজের মতো অতি জটিল ব্যাপারে কি আমার পক্ষে সহীহ হাদিস পড়ে নামাজ শিক্ষা করা কিভাবে সম্ভব ? যদি আমার পক্ষেই সম্ভব না হয় আমার ৭ বছরের ছেলে কিংবা পড়ালেখা না জানা বুয়ার পক্ষে কিভাবে সম্ভব ?

প্রশ্ন ৭: যদি সম্ভব না হয় তাহলে আমাকে এমন একজনের আলিমের দারস্ত হতে হবে যিনি সব হাদিস পড়ে বুঝে আমাকে নামাজের নিয়ম কানুন বুঝিয়ে দিবেন,তাইনা ? হাদিস গুলির সমন্বয় করে যদি উনি ব্যাখ্যাই করেন তাহলে ফিকহ তো ফিকহই হয়ে গেলো । এই ক্ষেত্রে আমি কি সহীহ হাদিস মানছি নাকি ফিকহ ? এই ফিকহ মানার মাধ্যমে আমি কি বাস্তবে আমি সমন্বয়কৃত সহীহ হাদিসই মানছি না ?

প্রশ্ন ৮: আমি যদি আরেকজন আলিমের কাছে যাই এবং একই অনুরোধ করি হাদিস ঘেটে নিয়ম কানুন বানিয়ে দেয়ার জন্য । উনিও সব হাদিস ঘেটে আমাকে নিয়ম বানিয়ে দিলেন। প্রথম আলিমের নিয়ম গুলি আর দ্বিতীয় আলিমের নিয়ম গুলি কি হুবুহু একই হবে ? নাকি তাদের দুজনের সমন্বয় পদ্ধতি আলাদা হতে পারে ?

একজনের কাছে এক হাদিস বেশি সহীহ অন্য জনের কাছে কম সহীহ লাগতে পারে না ? দুজন একই হাদিসের অর্থ কে দুই ভাবে নিতে পারে ? তারা কি আরবি ইবারত ভিন্ন ভাবে পড়তে পারেনা ? হাদিসের শত শত কিতাবের উনি হয়তো কিছু পড়েছেন অন্যজন কিছু ? রাবী দুর্বল কিনা এই নিয়ে ইখতেলাফ আছেনা ? কারো কারো মতে বুখারী সব চেয়ে সহীহ, কারো মতে মুয়াত্তা ইমাম মালিক, এরকম অচেনা ?

আরো কত কারণ আছে, হাদিস শাস্ত্র কি অংকের মতো যে রেজাল্ট একটাই হবে ? তাহলে দুজনেরই সহীহ হাদিস মানা সত্ত্বেও দুজনের নামাজের নিয়ম দুই ধরণের হতে পারেনা ? আমার কি সেই যোগ্যতা আছে যে আমি বলতে পারবো প্রথম জন বেশি ঠিক না দ্বিতীয় জন ?

প্রশ্ন ৯: ধরেন আমি প্রথম আলিমের কাছে যাওয়ার পর উনি আমার অনুরোধে সকল হাদিস ঘেটে আমার জন্য নামাজের নিয়ম বানিয়ে দিয়েছেন। এখন আমার ভাই যদি তার কাছে যেয়ে একই অনুরোধ করে তাহলে কি তিনি এই কাজটি হাদিস ঘাটার কাজটি কি আবার করবেন ? নাকি আমাকে যে নিয়ম গুলি উনি দিয়েছেন সেগুলিই আমার ভাইকেও দিয়ে দিবেন ? আমার ভাই আজ থেকে ১০ বছর পর গেলে একই নিয়মি তো পাবেন ওই আলিম থেকে তাইনা (কারণ যে হাদিস দেখে নিয়ম তৈরী করেছেন সেই হাদিস তো আর ১০ বছরে পরিবর্তন হয়নি) ? ৫০ বছর পর কেউ গেলে ? এখানে কি নামাজের নিয়ম পরিবর্তন হওয়ার খুব বেশি সুযোগ আছে ? ১৩০০ বছর পর ? নাকি প্রত্যেকবার শুরু থেকে হাদিস ঘাটতে হবে ?

যদি পরে আমরা প্রথম আলিমের বের করা নিয়ম কে মাজহাব বা ফিকহে X ও দ্বিতীয় আলিমের বের করা নিয়ম কে মাজহাব বা ফিকহে Y নাম দি , তাহলে X ও Y ফলো করা কি ১৩০০ বছর পর হারাম হয়ে যাবে, যেখানে এটি ১৩০০ বছর আগে সহীহ ছিল ?

প্রশ্ন ১০: নামাজ তো আর নতুন জিনিস না। এটি ইসলামের শুরু থেকে চলছে। তাহলে এই হাদিস ঘাটাঘাটি করে নামাজের নিয়ম বের করার কাজও তখন থেকেই হওয়ার কথা। তখন থেকেই যদি ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) বা ইমাম মালিক (রহঃ) বা ইমাম শাফেঈ (রহঃ) বা ইমাম আহমদ (রহঃ) যদি এই হাদিস ঘাটাঘাটি করে নামাজের নিয়ম বের করার কাজটি করে গিয়ে থাকেন, নামাজের নিয়ম তো আর পরিবর্তন হয়নি, তাহলে এখন সেগুলি মানতে সমস্যা কোথায় ?

ইমাম নাসিরুদ্দিন আলবানী সাহেব এই যুগে এসে হাদিস ঘাটাঘাটি করে যে নিয়ম বের করেছেন তা ওগুলোর উপর প্রাধান্য পাবে কেন ? ওই চার ইমামের কারো যোগ্যতা কি ইমাম নাসিরুদ্দিন আলবানী সাহেবের চেয়ে কম ছিল ?

প্রশ্ন ১১: এখন যদি কেউ বলেন যে সাহাবীরা রাসূলুল্লাহ (দঃ) এর ওফাতের পর সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়েন। এক্ষেত্রে দুটি বিষয় হতে পারে।
হয়তো প্রধান সাহাবীরা যেসব এলাকায় গিয়েছিলেন বা ছিলেন সেসব জায়গায় নামাজ সম্পর্কিত সব হাদিস ছিল। এই ক্ষেত্রে ইমাম আবু হানিফার কাছে কুফায় বা ইমাম মালিকের কাছে মদিনায় নামাজ সংক্রান্ত সব হাদিস ছিল। এই ক্ষেত্রে তারা এসব বেছেই নামাজের নিয়ম বানিয়েছেন। ওই নিয়ম ফলো করতে আপত্তি কোথায় ?

অথবা . সাহাবীরা যেসব এলাকায় গিয়েছিলেন সেখানে নামাজ সম্পর্কিত সব হাদিস ছিলোনা, কিছু হাদিস ছিল।
তাই কোনো এক এলাকায় যেমন ইমাম আবু হানিফার কুফায় কিংবা ইমাম মালিকের মদিনায় সব হাদিস ছিলোনা। পরে সব হাদিস একত্রিত হয়েছে। তাই সব হাদিস বাছাই করে বানানো ল্যাটেস্ট ইমাম আলবানী সাহেবের নামাজের নিয়ম বেশি শুদ্ধ।

আমার প্রশ্ন হচ্ছে ওই সব এলাকায় আংশিক হাদিস থেকে বানানো আংশিক নামাজের নিয়ম পালন করে যদি সালাফ তথা তাবেঈ ও তাবে-তাবেঈনরা শ্রেষ্ঠ প্রজন্ম হয় তাহলে ওই আংশিক নিয়ম পালন করলে আমরা কেন ধরা খাব কিংবা সাওয়াব কম পাবো ?

প্রশ্ন ১২: সুন্নাহর বিস্তার এর একমাত্র মাধ্যম কি হাদিস ? এছাড়া কোন মাধ্যম নেই ? ওযুর কথাই ধরুন না। যখন সাহাবীরা তাদের সন্তান বা তাবেঈদের ওযু শিক্ষা দিতেন তখন কি শুধু হাদিস বর্ণনা করতেন ?

নাকি হাতে কলমে নবীজির (দঃ) এর কাছ থেকে শেখা ওযুর মতো করে ওযু করে অন্যদের শিক্ষা দিতেন ?

তাহলে তাবেঈ বা তাবেঈ-তাবেঈনদের সংস্পর্শে এসে প্র্যাকটিকাল নামাজ শিক্ষার পদ্ধতি ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) কিংবা ইমাম মালিকের (রহঃ) বেশি জানার কথা নাকি ইমাম নাসিরুদ্দিন আলবানী সাহেবের।

ইমাম আলবানীর কাছে তো শুধু হাদিস আছে , কিন্তু ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম মালিকের কাছে হাদিসের সাথে সাথে প্র্যাকটিকাল শিক্ষাও তো ছিল। কার নামাজের নিয়ম বেশি শুদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি ?

প্রশ্ন ১৩ঃ- ইমাম চতুষ্টয়ের বানানো নামাজের নিয়ম প্রায় ১৩০০ বছর ধরে মুসলিম উম্মাহ ফলো করে আসছে। উম্মাহর ইতিহাসের বাঘা বাঘা আলিম এগুলি মেনে নামাজ পড়েছেন । এমন সময় যখন ইসলাম দুনিয়াতে বিজয়ী ছিল, যখন মুসলিমদের ঈমান আমল ও ইখলাস বর্তমান মুসলিমদের চেয়ে বেশি ছিল। আর ইমাম নাসিরুদ্দিন আলবানীর তৈরী নামাজের নিয়ম অপেক্ষাকৃত অনেক কম মানুষ অনেক কম দিনের জন্য ফলো করছে, যখন মুসলিমদের ঈমান, আমল ও আখলাক সব চেয়ে নিচে। প্রথমোক্ত গ্রূপের বহু মুসলিমদের ভুল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি নাকি দ্বিতীয় গ্রূপের কম মুসলিমদের ?

প্রশ্ন ১৪: কুরআনে বলা আছে শুধু মাত্র বাপ্ দাদারা করতো বলে কোন কিছু করা উচিত না। কিন্তু তা কি মুশরিক বাপ্ দাদাদের ব্যাপারে বলা হয়নি ? বাপ্ দাদা যদি মুসলিম হয় তাহলে তো তাদের মান্য করতে কোনো দোষ আছে ?

যেমন নবী ইয়াকুব (আঃ) মৃত্যুর সময় তার পুত্রদের জিজ্ঞাসা করেছিলেন তারা তার পরে কার ইবাদত করবে । তার ছেলেরা উত্তর দিয়েছিলেন তাদের বাপ্ দাদাদের উপাস্যের। বাপ্ দাদা সঠিক রাস্তায় থাকলে সেই রাস্তা দিয়ে হাটা যাবেনা এমন কথা কি বলা আছে ? নূহ (আঃ) এর ছেলে যদি এই যুক্তি দিত যে বাপ্ দাদা মেনে আসছে বলে আমরা মানবোনা এটা কি সঠিক হতো ?

এসব প্রশ্নের উত্তর আমাকে সালাফী হতে দিলোনা।

আমি হানাফীই থাকলাম। এবং মন ভরে দুআ করলাম সেই সব আলিমদের যারা আমাদের জন্য নিজেদের সারা জীবন বিলিয়ে দিয়ে সহজ ফিকহের কিতাব লিখে গিয়েছেন, যা মাত্র ১০০/২০০ টাকা দিয়ে কিনে কিংবা আলিমের সোহবতে শিখে আমল করে আমরা অমূল্য অফুরন্ত অনিঃশেষ জান্নাতের জন্য কাজ করতে পারি।

বিশেষ দ্রঃ ইমামে আজম আবু হানীফা রহ.একজন তাবেয়ী ছিলেন।

শুক্রবার সূরা কাহাফ তিলাওয়াতের ফযিলত ও আল্লামা বাবুনগরী হাফিযাহুল্লাহুর আমাল

শুক্রবারে সূরা কাহাফ তিলাওয়াতের অনেক ফযিলত রয়েছে। সূরা কাহাফ পবিত্র কোরআনের অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ একটি সূরা, যা মক্কায় অবতীর্ণ হয়। এর মোট আয়াত সংখ্যা ১১০। নিয়মিত সূরাটি তিলাওয়াতে অসংখ্য সওয়াবের কথা বিভিন্ন হাদিসে বর্ণিত হলেও বিশেষত জুমার দিনে এ সূরা তিলাওয়াতের অনেক সওয়াব ও ফজিলত রয়েছে।

হজরত আবু সাঈদ খুদরি (রা.) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, যে ব্যক্তি জুমার দিন সূরা কাহাফ তিলাওয়াত করবে তার জন্য এক জুমা থেকে অপর জুমা পর্যন্ত নূর হবে।

আমীরে হেফাজত আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী হাফিযাহুল্লাহু একজন বয়োবৃদ্ধ শায়খুল হাদীস। শারীরিক অসুস্থতা ও দ্বীনি প্রোগ্রাম সহ নানা ব্যস্ততার মাঝেও প্রতি শুক্রবারে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে সূরা কাহাফ তিলাওয়াতের আমাল করেন ।

আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী দা.বা. হাফেজে কুরআন। শুধু হাফেজ নন বরং তুখোড় হাফেজ। এই বয়োবৃদ্ধ বয়সেও হযরতের কুরআন শরীফের ইয়াদ (মুখস্থ) আশ্চর্যজনক। এরপরও মাদরাসায় থাকা অবস্থায় কুরআন শরীফ হাতে নিয়ে সূরা কাহাফ তিলাওয়াত করেন তিনি।

কিছুদিন আগে শায়খের সাথে এক মাহফিলের সফরে ছিলাম। আমাদের রাত্রিযাপন হয়েছিল হোটেল উজান ভাটিতে। সকালে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের উদ্দেশ্যে শায়েখের সাথে রওয়ানা হলাম। গাড়ি ছাড়ার কিছুক্ষণ পর শায়েখ তিলাওয়াত শুরু করলেন। গাড়িতে আমরা যারা শায়খের রফিকে সফর ছিলাম,মনোযোগ সহকারে শায়খের তিলাওয়াত শুনছিলাম। আহ! কি মায়াভরা সুন্দর কন্ঠের তিলাওয়াত!!

শায়েখ আল্লামা বাবুনগরী হাফিযাহুল্লাহুর কুওয়্যাতে হাফেজা বা মুখস্থশক্তি অনেক বেশি। এখন পর্যন্ত কুরআন শরীফ যেই ইয়াদ সদ্য হিফজ সমাপ্ত করা অনেক হাফেজেরও এতো ইয়াদ আর মুখস্থ থাকে না। শায়েখ বিনয় প্রদর্শন করে আমাকে বললেন,জুনাইদ! তুমি খেয়াল করিও তো তিলাওয়াতের মধ্যে আমার কোন আয়াত ছুটে যায় কিনা। শায়েখ বলার পর আমি আরো মনযোগ সহকারে তিলাওয়াত শুনতে লাগলাম। শায়খের তিলাওয়াত যতই শুনতে ছিলাম ততই যেন তৃপ্তিবোধ করছিলাম। কোন কৃত্তিমতা, কোন লৌকিকতা নেই শায়েখের তিলাওয়াতে। অর্থের দিক খেয়াল করে,দরদমাখা ভাঙ্গা কন্ঠে শায়েখের তিলাওয়াত আমার কাছে এতো সুমধুর ও মজা লাগছিল যা ভাষা আমার শৈলীতে প্রকাশ করা সম্ভব নয়।

আল্লামা বাবুনগরী হাফিযাহুল্লাহু এই বয়োবৃদ্ধ বয়সেও জুমাবারে সূরা কাহাফ তিলাওয়াতের আমাল করেন তিনি৷ অথচ আমরা অনেকে নবীনরাও এই ফযিলতপূর্ণ আমাল সম্পর্কে উদাসীন থাকি।

সূরা কাহাফের ফযিলত সম্পর্কে হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, এ পুর্ণাঙ্গ সূরাটি এক সঙ্গে নাজিল হয়েছে এবং এর সঙ্গে ৭০ হাজার ফিরিস্তা দুনিয়াতে আগমন করেছেন।

আবু সাইদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যেমনভাবে নাজিল করা হয়েছে, সেভাবে যে ব্যক্তি সূরা কাহাফ পড়বে, তার জন্য সেটা নিজের স্থান থেকে মক্কা পর্যন্ত আলো হবে এবং যে শেষ দশ আয়াত পড়বে, সে দাজ্জালের গণ্ডির বাইরে থাকবে এবং দাজ্জাল তার ওপর কোনোরূপ প্রভাব বিস্তার করতে পারবে না। (সুনানে নাসাঈ, হাদিস নং : ১০৭২২)

আল্লাহ তায়া’লা আমাদেরকে শুক্রবারে সূরা কাহাফ তিলাওয়াতের আমাল করার তাওফিক দান করুন,আমিন।

লেখা:
H.M.Zunaid
শিক্ষার্থী : দারুল উলুম হাটহাজারী।
সভাপতি : জাতীয় লেখক পরিষদ
(হাটহাজারী শাখা)

অনির্দিষ্ট কালের জন্য ফেসবুক  নামক গজব থেকে বিদায়: মুফতি রিজওয়ান রফিকী

প্রিয় বন্ধুগণ,

দীর্ঘদিন আপনাদের সাথে এই ফেসবুক জগতে ছিলাম। যতটুকু পেরেছি ফেরাকে বাতেলার মুখোশউম্মোচনে কাজ করেছি। ইসলামের অপব্যখ্যাকারীদের প্রত্যেকটি বিভ্রান্তির জবাব দেয়ার চেষ্টা করেছি। অহেতুক পোষ্ট খুব কমই দিয়েছি। কারণ সকলের সময়ের দাম অনেক বেশী।

কিন্তু বর্তমান সময়ে আমাদের নিজেদের কামড়াকামড়ি ও কাদা ছোড়াছুড়ি, ইসলামী রাজনীতির নামে নিজস্ব ব্যানারের চিন্তা, ভালোবাসার আড়ালে অতি বাড়াবাড়ি আর তেলের ঘষাঘষি, ভক্তির নামে অন্ধপুজারী, ইসলামী বিপ্লবের চেয়ে দলের বিপ্লবের চিন্তা অনেক বেশী। কেউ এখন আর সামষ্টিক চেতনা লালন করেন না।

উপরন্তু আমরা যারা আহলে হকের সকলকে নিয়ে সামনে এগোতে চাই, আমাদেরকেই বরং বলা হয় আমরা নাকি গোলআলু! আমরা নাকি মাহফিল পাওয়ার ধান্ধায় সকলের কাছে ঘুরি। ভিন্ন দলের কারো সাথে সাক্ষাত করলেই সে দলের ট্যাগ লাগিয়ে দেয়া হয় আমাদেরকে। যা মেনে নেয়া খুব কষ্টের।

প্রিয় বন্ধু,

এখন সবাই বাঁশ বাগানে ঘোরে, ফুল বাগানে ঘোরার মানুষ খুবই কম। এ জগতে অনেক মানুষকে দেখেছি, যারা উপরে দেখতে অনেক নুরাণী বাট ভেতরে হিংসার ডিব্বা। কে কাকে থামাবে, কে কাকে বাঁশ দেবে সে চিন্তায় তাদের মাথার চুলে পাক ধরেছে। কারো কাছে ভিড়লেই তারা আমাদেরকে তাদের নিজস্ব স্বার্থে ব্যবহার করতে চান, মানে তারা আমাদেরকে তেলের সেলসম্যান বানাতে বদ্ধপরিকর। কিন্তু আমরা তো একমাত্র রবের দালাল।

আমি সব সময় হেফাযত,খেলাফত,চরমোনাই,জমিয়ত,তবলীগ দেওবন্দী সকল ধারাকে এক নজরেই দেখেছি,আজও দেখি। যতদিন আকীদা নষ্ট না হচ্ছে ততদিন একই নজরে দেখবো। কাউকে জোর করে বাতিল বানানো আমার চেতনা নয়। আমি আহলে হকের সকল দলকে এক হাতের পাঁচটি আঙ্গুল মনে করি। যখন ইসলাম বিদ্বেষীদের ধরবো, তখন মজবুতির জন্য পাঁচটি আঙ্গুলই তো আমার লাগবে। তাই নয় কি?

কখনও উস্তাযে মুহতারাম মামুনুল হক সাহেবের দোষচর্চা, কখনও মুফতী ফয়জুল করীম সাহেবকে অশ্রাব্য ভাষায় কটুক্তি, কখনও সমালোচনার তীর মুহতারাম আইয়ুবী সাহেবের দিকে, আবার কখনও মুহতারাম হাফিজ ভাই সমালোচকদের টার্গেটে পরিনত হচ্ছেন। অথচ তথাকথিত এ বিপ্লবী প্রতিবাদীরা এক কলম পন্নীকে নিয়ে লেখেনি, লেখেনি কাদিয়ানীকে নিয়েও। ওদের টার্গেটের স্বীকার কখনও হয়নি সাহাবাবিদ্বেষী মওদুদী।

এ দেশে খ্রীষ্টান মিশনারীর কাজ ধুমছে চলছে উত্তরবঙ্গে। এরা কখনও ওদেরকে নিয়ে ভাবতেও শেখেনি, কারণ সব মুসলিম বেঈমান হয়ে যাক এতে ওদের কি? এগুলো কোনো সমস্যাই না। সমস্যা শুধু নিজ দলের আলাদা শক্তি। এমন হাজারে ব্যাথা এ বুকে চেপে রাখি, স্বপ্ন দেখি একদিন সবাই এক হয়ে সকল বাতিলের জন্য মহাহুমকি হয়ে দাঁড়াবে। অবশ্য আমার এ চেতনা নিয়ে সারা দেশে আমার কার্যক্রম চলছে, একদিন একটা শক্তিশালী রেঁনেসা তৈরি করবো। ইনশাআল্লাহ। সেদিন আমরা সম্মিলিতভাবে সকল বাতিলের বিরুদ্ধে এক সাথে কথা বলবো। ইসলামী আকীদা সংরক্ষণ পরিষদ সে লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। আলহামদুলিল্লাহ।

প্রিয় ভাই,

আজ থেকে আপনাদের এ জগত থেকে বিদায় নিচ্ছি। অবশ্য আমার কার্যক্রম থেমে যাবে না। আমার নিয়মত লেখাগুলো পড়তে চাইলে আমার ব্যক্তিগত ওয়েবসাইট rijwanrafiqi এ নজর রাখবেন। অবশ্য যদি কোনোদিন মন চায়, পরিবেশ ভালো হয় সেদিন আবার ফিরে আসবো। ইনশাআল্লাহ। সকলে আমার সব ভুল, অপরাধ মাফ করে দেবেন। জাযাকুমুল্লাহ।

ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে কওমি মাদ্রাসা | মুফতি তাকি উসমানী হাফি:

ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে কওমি মাদ্রাস! ছাত্র উস্তাদের মধ্যে রুহানিয়াত নেই। শুধু ক্ষমতা আর প্রতি হিংসার আগুন জলছে -শিক্ষক তলাবাদের মধ্যে!

অনুবাদ: ইবনে নাজ্জার সূত্র: “শাহ রাহে ইলম”

(এই লেখাটা মুফতি তাকি উসমানী সাহেব হাফি. কওমি মাদ্রাসার বর্তমান এই দুরাবস্থা দেখে, নিজের শত শত তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে লিখেছেন। মনের গভীরে চেপে রাখা অনেক দিনের কষ্ট আর আফসোস গুলো কলমের ভাষায় প্রকাশ করেছেন।

তাই প্রত্যেকটা কওমি মাদ্রাসার সম্মানিত শিক্ষক মন্ডলী ও পরিচালনা কমিটির কাছে, এই লেখাটি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অত্যন্ত মনোযোগের সাথে পড়ার আন্তরিক নিবেদন রইল।

আল্লাহ তা’আলা আমাদের সবাইকে আমল করার তাওফিক দান করুন।)

তিনি বলেন, অনেক চিন্তা ভাবনা করার পর যতোটুকু আমি বুঝতে পারলাম তা হল; কওমি মাদ্রাসার অধঃপতনের মূল কারণ হল “আস্তে আস্তে কওমি মাদ্রাসার শিক্ষা ব্যবস্থাটা গতানুগতিক একটি প্রথায় পরিণত হয়েছে। আর এর আসল উদ্দেশ্য আমরা ভুলে গিয়েছি”। যদিও আমাদের মুখে এখনো এ কথাই শোনা যায় যে, “এই শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হল ইসলাম ধর্মের খেদমত করা”। তবে তিক্ত বাস্তবতা হল, এগুলো শুধু মুখেই বলা হয় অন্তরে থাকে অন্য কিছু। কেননা বাস্তবেই যদি আমাদের অন্তরে এই উদ্দেশ্য থাকত, তাহলে আমাদের সার্বক্ষণিক ব্যস্ততা এটাই থাকত। আকাবির ও আসলাফদের মত সর্বদা আমাদের মাথায় ঘুরত, আমাদের কোনো কাজে আল্লাহ তা’আলা অসন্তুষ্ট হচ্ছেন কিনা?

আমাদের কাজে-কর্মে দ্বীনের কতটুকু খেদমত হচ্ছে?

আমরা আমাদের মূল উদ্দেশ্যে কতটুকু সফল হয়েছি?

বরং উল্টো আমরা আমাদের সম্পূর্ণ মনোযোগ মাদ্রাসার বাহ্যিক উন্নতিতে লাগিয়েছি, যা আমাদের আসল উদ্দেশ্য নয়। বেশিরভাগ মাদ্রাসার পরিচালকরা সর্বদা এটাই চেষ্টা করেন যে, কিভাবে আমার মাদ্রাসাটা প্রসিদ্ধতা লাভ করবে? কিভাবে ছাত্রের সংখ্যা বাড়ানো যাবে? কিভাবে দেশের নামকরা শিক্ষকদের এখানে জমায়েত করা যাবে?

এক কথায় কিভাবে জনসাধারণের মাঝে মাদ্রাসা এবং মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির ভালোবাসা আর গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পাবে? আর এগুলোর পিছনে আমাদের অক্লান্ত পরিশ্রম আর রাত-দিনের দৌড়ঝাঁপ দেখলে তো মনে হয়, এগুলোই আমাদের আসল উদ্দেশ্য। আবার এই উদ্দেশ্য পূরণ করার জন্য আমরা এমন পন্থাও অবলম্বন করি, যা একজন আলেমের জন্য কখনো সমিচীন নয়। বরং কখনো কখনো তো আমরা স্পষ্ট নাজায়েজ আর অবৈধ-পন্থা অবলম্বন করতেও দ্বিধাবোধ করি না।

অন্যদিকে যদি কোনো মাদ্রাসা মোটামুটিভাবে এগুলো অর্জন করে ফেলে, তাহলে মনে করা হয় আসল উদ্দেশ্য পূরণ হয়ে গেছে। অথচ আমাদের ছাত্রদের শিক্ষা, চারিত্রিক ও ধর্মীয় অবস্থা কেমন? আমরা মুসলিম সমাজ পরিচালনা করার জন্য কেমন মানুষ তৈরি করেছি?

আমাদের চেষ্টা ও মুজাহাদার দ্বারা বাস্তবে ইসলামের কতটুকু উপকার হচ্ছে? সেগুলোর কোন খবরই থাকে না।

আর আস্তে আস্তে তো এসব বিষয়ের খোঁজখবর নেওয়া, চিন্তাভাবনা করার মানুষও কমে যাচ্ছে।

মোটকথা এই অধঃপতনের মূল কারন হল, “খিদমতে দ্বীন আমাদের আসল উদ্দেশ্য” এটা একবার মুখে উচ্চারণ করার পর কর্মজীবনে আমরা তা ভুলে যাই। আর এই বাহ্যিক জিনিসগুলো ঘিরেই চলতে থাকে আমাদের মেহনত-মুজাহাদা, শ্রম-সাধনা সবকিছুই। অথচ এগুলো আমাদের মূল উদ্দেশ্য নয়। বরং এগুলোর সাথে তো ইসলামের কোনো সম্পর্কই নেই আর থাকলেও এই শর্তে যে, আমাদের মূল উদ্দেশ্য ইসলামের উন্নতি ও অগ্রগতির জন্য নিয়ত শুদ্ধ রেখে এগুলোকে শুধু মাত্র মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করা যেতে পারে। কিন্তু অত্যন্ত আফসোস ও পরিতাপের বিষয় হল, আমরা এগুলোকেই মূল উদ্দেশ্য বানিয়ে ফেলেছি।

এমনিভাবে কওমি মাদ্রাসার গৌরবময় ইতিহাসের এক উজ্জল বৈশিষ্ট্য হল, এখানের শিক্ষক ছাত্রদের পারস্পরিক সম্পর্কটা গতানুগতিক সাধারণ কোন সম্পর্ক নয়, যা শুধু মাত্র শ্রেণিকক্ষের চার দেওয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। বরং এটা পরস্পরের মধ্যে আত্মার পবিত্র সম্পর্ক। যা শিক্ষা জীবন থেকে শুরু করে মৃত্যু পর্যন্ত অটুট থাকত। উস্তাদ শুধুমাত্র কিতাব পড়ানোর জন্য নিযুক্ত কোন শিক্ষক ছিল না, বরং নিজ ছাত্রদের জন্য তাঁরা ছিলেন কল্যাণকামী দরদী এক মহান পিতা।

আর ছাত্রদের চারিত্রিক ও আধ্যাত্মিক দিক নির্দেশনা প্রদান কারী। ইলম ও আমলের ময়দানে ছাত্রদের শুভাকাঙ্ক্ষী এক অভিভাবক। সাথে সাথে তাঁরা ছাত্রদের নিজস্ব বিষয়গুলোও দেখাশোনা করতেন। ফলে ছাত্ররা শিক্ষকদের থেকে পুঁথিগত শিক্ষা পাওয়ার সাথে সাথে চারিত্রিক শিক্ষাও গ্রহণ করত। তাঁদের থেকে জীবন পরিচালনা করা শিখত। শিখত ধার্মিকতা, একনিষ্ঠতা, বিনয়-নম্রতাসহ উত্তম চরিত্রের আরো অনেক গুণাবলী। আর এভাবেই ছাত্ররা শিক্ষা-দীক্ষায়, জ্ঞান ও প্রজ্ঞায় শিক্ষকদের সাদৃশ্য হয়ে উঠত।

বিশেষ করে “দারুল উলুম দেওবন্দ” যেই মৌলিক বৈশিষ্ট্যের কারণে বিশ্বের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে এক ভিন্নরকম উচ্চতায় পৌঁছেছে।

তা হল, এটি শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয় বরং আদর্শ মানুষ গড়ার এক বিশাল কারখানা। যেখানে শিক্ষার চেয়ে দীক্ষার পরিমাণই বেশি থাকে। ফলে তৈরি হয় সঠিক শুদ্ধ আকিদায় বিশ্বাসী একনিষ্ঠ একজন পাক্কা মুসলমান। যারা কথার চেয়ে বেশি নিজেদের সুন্দর আচার-ব্যবহার আর উত্তম চরিত্রের মাধ্যমেই ইসলামের প্রচার-প্রসার করে।

কিন্তু আফসোসের বিষয় হল আস্তে আস্তে এ বিষয় গুলো আদিম যুগের ইতিহাসের মতো হয়ে যাচ্ছে।

আর এর মূল কারণ হচ্ছে শিক্ষকরা নিজেদের মূল উদ্দেশ্য এটা কে বানিয়েছেন যে, শ্রেণিকক্ষে এমন ভাবে পড়ানো যাতে ছাত্ররা খুশি হয়ে যায। তাঁরা সব সময় ভাবতে থাকে, পড়ানোর জন্য তাঁদেরকে কেমন প্রবন্ধ বা কিতাব দেওয়া হয়েছে? কিভাবে ছাত্রদের ওপর নিজের জ্ঞানের প্রভাব পড়বে?

কোন পদ্ধতি অবলম্বন করলে ছাত্রদের মাঝে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে? আর এই গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে গিয়ে কোন পদ্ধতিতে পড়ালে ছাত্রদের বেশি উপকার হবে, সেটা ভুলে যায়। বরং কখনো তো তাঁরা খুঁজতে থাকে যে, কোন পদ্ধতিটা ছাত্রদের প্রবৃত্তির চাহিদা অনুযায়ী হবে? ফলে শিক্ষকগণ ছাত্রদেরকে দিক-নির্দেশনা দেওয়ার পরিবর্তে তাদের প্রবৃত্তির অনুগত হয়ে যায়। আর ছাত্ররা শিক্ষকের পিছনে চলে না বরং শিক্ষকরা ছাত্রদের চাহিদার পিছনে দৌড়াতে থাকে।

  • কিন্তু কিভাবে পড়ালে ছাত্রদের উপকার হবে?
  • কী কী শেখালে ছাত্ররা ধর্ম, দেশ ও জাতির জন্য আরও উপকারী হিসেবে গড়ে উঠবে?
  • ছাত্রদের কী ধরনের আগ্রহ-উদ্দীপনা, চাহিদা তাদের জন্য ক্ষতিকর?
  • কিভাবে ক্ষতিকর জিনিস থেকে তাদের আগ্রহ দূর হবে?
  • শ্রেণীকক্ষের বাইরে তারা কিভাবে চলা ফেরা করছে?

এগুলো বিষয় নিয়ে চিন্তাভাবনা করা, ছাত্রদের জীবনের মূল উদ্দেশ্য পূরণে এগিয়ে আসার মতো লোকেরাও আস্তে আস্তে শেষ হয়ে যাচ্ছে।

তাই এখন সর্বপ্রথম আমাদের প্রত্যেকের নিজ নিজ এলাকায় কওমি মাদ্রাসার মৃত্যুপ্রায় এই “প্রাণ” পুনরায় তাজা করার প্রয়োজন। কেননা এটি ছাড়া আমাদের কওমি মাদ্রাসাগুলো বেশির থেকে বেশি আক্ষরিক জ্ঞানের “কেন্দ্র” হতে পারবে। ইসলামের সবচেয়ে বড় ভয়ঙ্কর শত্রু ইউরোপ আমেরিকার মুশরিক প্রাচ্যবিদদের মতো মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করা এবং নির্দিষ্ট কিছু বিষয় পড়াশোনা করানোই আমাদের মূল উদ্দেশ্য হয়ে যাবে। আর আস্তে আস্তে একদিন আমরা দ্বীনি শিক্ষার অপরিহার্য ও আবশ্যকীয় এই বৈশিষ্ট্যগুলি হারিয়ে, অবশেষে একদিন দ্বীনহারা হয়ে পড়ব।

কওমি মাদ্রাসার এই প্রাণ যা সময়ের ঘূর্ণিপাকে আস্তে আস্তে নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে, এটাকে পুনর্জীবিত করতে সবচেয়ে বড় গুরুদায়িত্ব হল প্রত্যেকটি মাদ্রাসার শিক্ষক এবং পরিচালনা কমিটির সদস্যের উপর। তাদের উচিত হল সর্ব প্রথম তাঁরা নিজেদের আমল-আখলাকের দিকে নজর দিবে।

তাঁরা দেখবে

  • ইসলামী শিক্ষা তাদের জীবনে কোনো পরিবর্তন এনেছে কি না?
  • আল্লাহর ভয় আর আখেরাতের চিন্তায় তাঁদের অন্তর কেঁপে ওঠে কি না?
  • রবের সাথে তাঁদের নৈকট্য বৃদ্ধি পেয়েছে কি না?
  • ইবাদতের প্রতি তাঁদের আগ্রহ কতটুকু বৃদ্ধি পেয়েছে?
  • আমলের যেই ফজিলতগুলো দিনরাত তাঁরা অন্যকে শোনাচ্ছেন, নিজেরা তার উপর কতটুকু আমল করছেন?
  • আল্লাহর রাস্তায় দান সদকা করার জন্য অন্যদেরকে কুরআন হাদীস শুনিয়ে যেই উৎসাহ উদ্দিপনা দেওয়া হয়, নিজেরা তাতে কতটুকু অংশ গ্রহণ করেছে?
  • ইসলামের জন্য জান ও মালের কুরবানী দেওয়ার জন্য কতটুকু প্রস্তুতি নিয়েছে? সমাজের এই অধঃপতনে তাঁরা অস্থির হয়ে ছটফট করছে কি না?
  •  সুন্দর সুশীল সমাজ বিনির্মাণের চিন্তা-চেতনা তাদের মন-মস্তিস্কে কতটুকু প্রভাব ফেলেছে?

যদি এ বিষয় গুলো নিয়ে আমরা চিন্তা করি, বাস্তবতা আর সততার সাথে নিজেদের মাঝে এগুলোর উত্তর খুঁজি তাহলে লজ্জায় শরমে মাথা নিচু করে আফসোস আর অনুতাপ করা ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না।

তাই এখন সময়ের দাবি, এই আফসোস আর অনুতাপ থেকে শিক্ষা নিয়ে আর লজ্জা-শরমকে কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যৎ সুন্দর করা।

তবে এটা সাময়িক হলে, তাতে কোন উপকার হবে না। বরং সর্বদা এটা মনেপ্রাণে ধারণ করে নিতে হবে, আর নিজেদের ভবিষ্যৎকে চোখের সামনে ভাসিয়ে তুলতে হবে। তাহলেই হয়ত আবার ফিরে যেতে পারি আমাদের হারিয়ে যাওয়া সেই সোনালী অতীতে।

আল্লাহ তা’আলা আমাদের সবাইকে দ্বীনের জন্য কবুল করুন।